About Us

বিভূতিভূষন – গৌরীকুঞ্জ – গৌরীকুঞ্জ উন্নয়ন সমিতি

বিশ্ব বাঙালীর হৃদয়ে রবীন্দ্রনাথ-এর সাথে সাথে যাঁর নাম উচ্চারিত হয়, – তিনি বিভূতিভূষন বন্দোপাধ্যায় .  বর্তমান গবেষনায় দেখা গেছে প্রকৃতি প্রেমিক সাহিত্যিক হিসাবে সারা বিশ্বে বিভূতিবাবুর নাম প্রকৃতি প্রেমিক কবি ওয়ার্ডওয়ার্থের সাথে একই সঙ্গে উচ্চারিত হয় .

বিভূতিভূষনের উপন্যাসে দেখা যায় মধ্যবিত্ত বাঙালী, গ্রামীন বাঙালী এবং নাগরিক বাঙালীর সহাবস্থান . আবার বিহার, ঝারখন্ডের প্রত্যন্ত গ্রাম, বনজঙ্গল, সেখানের অবাঙ্গালী মানুষ তাদের সহজ – সরল জীবনযাত্রা যা তাঁকে প্রভাবিত করেছিল উপন্যাসের পাতায় পাতায় তুলে ধরেছেন . তাঁর লেখনির অদ্ভূত বিশেষত্ব হল প্রকৃতি ও মানুষকে যেন আলাদা করা যায় না .

সুবর্ণরেখার তীরে অবস্থিত ঘাটশিলা দলমা রেঞ্জের পাহাড় ও জঙ্গল ঘেরা একটি অপূর্ব সুন্দর ছোট্ট শহর, পাহাড়, ঝর্না, জঙ্গল, নদী, ছোট ছোট টিলা,  নিয়ে গড়ে ওঠা ঘাটশিলায় –  বিভূতিভূষন ১৯৩৮ সালে একটি বাড়ী কিনেছিলেন . কথিত আছে শ্রী অশোক গুপ্ত, বিভূতিবাবুর কাছে পাঁচশত টাকা ধার করেছিলেন . পরবর্তী সময়ে তিনি ঐ টাকার বদলে বিভূতিবাবুকে বাড়ীটি দিয়েছেন . এই বাড়ীটিই গৌরীকুঞ্জ . প্রথমা স্ত্রী গৌরীদেবীর নামেই বিভূতিভূষন বাড়ীটির নামকরন করেন . ঘাটশিলার ডাহিগোড়ায় অবস্হিত গরিকুঞ্জ কেনার পিছনে সবথেকে বড় কারন ছিল . বিভূতিবাবু চেয়েছিলেন ডাক্তার ভাই নটুবিহারি ঐ বাড়ীতে থেকে চিকিত্সার কাজকর্ম দেখবেন . বিভূতিবাবু মাঝে মাঝেই চলে আসতেন তাঁর প্রিয় গৌরীকুঞ্জে . বাড়ীতে বসত সাহিত্যের আড্ডা বা আড্ডার সাহিত্য . সেই সময়ের প্রথিতযশা সাহিত্যিকরা আসতেন গৌরীকুঞ্জে . তারাশঙ্কর বন্দোপাধ্যায় থেকে শুরু করে – নিরদচন্দ্র চৌধুরী, সজনীকান্ত দাস, গোপাল হালদার, নীরদরঞ্জন দাসগুপ্ত, প্রমোদরঞ্জন দাসগুপ্ত, রাধারমন মিত্র, সুশীল কুমার দে এবং আরও অনেকে আসতেন . বাংলার সাহিত্যিকরা ছাড়াও বিভূতিবাবুর বিশেষ একজন বিহারীবন্ধু ছিলেন . যাঁর সাহিত্য রচনায় বিভূতিবাবু মুগ্ধ হয়েছিলেন . ‘Round The World’ –এর লেখক শ্রী জে.এন.সিনহা মহাশয়ের সাথে ১৯৩৯ সালে ঘাটশিলায় পরিচয় হয় বিভূতিবাবুর . পরবর্তী ক্ষেত্রে এই পরিচয় গভীর অন্তরঙ্গতায় পরিনত হয় . সিনহাজীর সাথে কথা বলে বিভূতিবাবুর নিসঙ্গতা দুর হতো .  সিনহাজী চিফ কানজারভেটর অব ফরেস্ট ছিলেন . তাই পেশার জন্য তাঁকে বনে জঙ্গলে ঘুরে বেড়াতে হতো .

তাঁর পেশা এবং বিভূতিবাবুর নেশা এই দুইয়ে মিলে বাংলা সাহিত্যকে অরণ্যসৌন্দর্যের চরম শিখরে পৌঁছে দিয়েছে . সাক্ষী গৌরীকুঞ্জ, ঘাটশিলা, রাখামাইল, চাইবাসা, বামিয়াবুরুর জঙ্গলের গল্প তাঁর অরণ্য বর্ণনায় ফিরে ফিরে এসেছে . ঝাড়গ্রাম, বাহরাগোড়া, চাকুলিয়া, নরসিংগড়ের কাছাকাছি লিপুকোচা ক্যাম্প, সবজায়গাতেই সিনহাজীকে সাথে করে কখনও একা – কখনও স্ত্রী কল্যানীকে নিয়ে ঘুরে বেরিয়েছেন প্রকৃতি প্রেমীক বিভূতিভূষন . আবার ফিরে এসেছেন গৌরীকুঞ্জে . পাহাড়, ঝর্না, নদীর সৌন্দর্য লিপিবদ্ধ করেছেন . শ্রী সিনহা তাঁর “পথের পাঁচালি” কে লেখক বইটিতে গৌরীকুঞ্জ সম্বন্ধে লিখেছেন, ঘাত্শিলায় বিভূতিবাবু তাঁর গৌরীকুঞ্জ বাড়ীতেই থাকতেন . ঘাটশিলার পশ্চিমদিকে মৌভান্ডারের কাছে . গৌরীকুঞ্জ ও মৌভান্ডারের মাঝখানে ছোট এক টুকরো শালবন ছিল . তামার কারখানাটিকে চোখের আড়াল করে রাখত . জায়গাটির স্থানীয় নাম দাহিগোড়া, দক্ষিণ পশ্চিম কোনে সুদুর থেকে সিদ্ধেশ্বর পাহাড় তাকিয়ে থাকে .  গৌরীকুঞ্জের পারিপার্শ্বিক নিস্তবতা অতল ও অতুলনীয় ছিল . বাড়ীটি, ঘাটশিলা ও মৌভান্ডারের রাস্তা থেকে একটু ভিতরে . যখনই আমি মোটরে গলিটির ভিতর মোড় ঘুরে ঢুকতাম মনে হত বাহির জগতের জন-কোলাহলের মলিনতা সমস্ত ধুয়ে মুছে গেল . গ্রীষ্মের মধ্যান্য়ে মনে হতো গভীর রাত্রির নিস্তব্ধতা .”

এই বইটির সুত্র ধরেই আমরা জানতে পারি, বিভূতিবাবু নিজের ঘরে একটি তাকে অনেক বই রাখতেন . তিনি একটি তক্তপোশের উপর বসে লেখাপড়া করতেন . অন্যান্য সাহিত্যিকেরা ঐ তক্তপোশেরই একপাশে তাঁর সামনে বসে কথাবার্তা বলতেন . মনে হত পুরাকালের মুনি-ঋষিদের তাপভূমিতে কোন ঋষি শিষ্যদের শিক্ষা দিচ্ছেন . সাহিত্যিক ও অতিথিদের ভিড় গৌরীকুঞ্জে প্রায়ই লেগে থাকত . সকলের প্রিয় কল্যানী বৌদি তাদের চা – খাবার খাওয়াতেন . ঘাটশিলার মুকুল চক্রবর্তী, দ্বিজেন মল্লিক প্রভৃতি সাহিত্য প্রেমী মানুষ বিভূতিভূষনের অত্যন্ত কাছের হয়ে উঠেছিলেন . এছাড়াও কলকাতার শ্রী প্রমথনাথ বিশী বিভূতিভূষনের পড়াতেই এসে উঠতেন ও থাকতেন . গৌরীকুঞ্জের ঘরে বসেই বহু সাহিত্যিকের সাহিত্যকর্মের গেট অল্প তৈরী হত, তাঁদের নানা সমস্যার সমাধানও করে দিতেন বিভূতিবাবু .

গৌরীকুঞ্জ সেই সময়ের বাংলা সাহিত্যের তীর্থক্ষেত্র ছিল . ১৯৫০ সালের ১লা নভেম্বর গৌরীকুঞ্জের ঘরেই দেহত্যাগ করেন বিভূতিবাবু . দাদার মৃত্যুর মাত্র ৮ দিনের মাথায় আত্মহত্মা করেন ভাই নটুবিহারী সুবর্ণরেখায় .

ধীরে ধীরে গৌরীকুঞ্জ কালের অতলে গিয়ে ধ্বংসস্তূপে পরিনত হয় . বিভূতিবাবুর স্মৃতি বুকে নিয়ে পর্যটকেরা আসতেন গৌরীকুঞ্জে আর নিরাশ হয়ে ফিরে যেতেন – কেননা গৌরীকুঞ্জ ধ্বসে পড়েছে . জঙ্গলের বুনো তলায় ঢেকে নিয়ে সাপখোপের আড্ডায় পরিনত হয়েছিল এই ঐতিহাসিক ভবনটি . রক্ষনাবেক্ষনের অভাব ছিল একমাত্র কারণ .

১৯৯৫ সাল থেকেই ক্রমাগত চেষ্টা চলছিল গৌরীকুঞ্জকে তার স্বরূপে ফিরিয়ে আনার . ঘাটশিলার কিছু মানুষ দৃঢ় সংকল্প নেন গৌরীকুঞ্জকে যে ভাবেই হোক ভগ্নাবস্তা থেকে উদ্ধার করতে হবে . ঐ সময়েই ঘাটশিলার এক তরুন যুবক তাপস চ্যাটার্জ্জী টুরিস্ট গাইডের কাজ করতেন . পর্যটকদের কাছে গৌরীকুঞ্জকে নিয়ে হতাশাভরা কথা শুনতে শুনতে কখন যেন নিজের মনে মনেই প্রতিঞ্জা করেন, – গৌরীকুঞ্জকে তার পুরনো গৌরব ফিরিয়ে দিতেই হবে . সেই সময়ের শ্রী প্রদীপ কুমার বালমুচু এগিয়ে এলেন . এগিয়ে এসেছিলেন এলাকার জনপ্রিয় মানুষ শ্রী রঞ্জিত বোস . এঁদেরই অনুপ্রেনায় এবং নিজের অসম্ভব মানসিক জোরকে সম্বল করে তাপস চ্যাটার্জ্জী ও অমিত মুখোপাধ্যায় (সাংবাদিক, দৈনিক স্টেটসম্যান) কাজে নেমে পড়লেন . বিভূতিবাবুর পুত্র তারাদাস বন্দোপাধ্যায়, পুত্রবধূ মিত্রা বন্দোপাধ্যায় এবং পৌত্র তথাগত বন্দোপাধ্যায়ের সঙ্গে ক্রমাগত বার্তালাপ চালিয়ে অবশেষে NOC যোগাড় হল . সবসময়েই সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছিলেন সাংসদ প্রদীপ কুমার মালমুচু .  সাংসদ তহবিল থেকে অর্থ প্রদান করলেন তিনি . গড়ে উঠল নতুন ভবন পুরনো স্মৃতিকে সঞ্জীবিত করে .

২০০৮ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারী ঐতিহাসিক ভাষাদিবসে নবনির্মিত গৌরীকুঞ্জের উদ্বোধন করলেন বিভূতিভূষনের একমাত্র আদরের সন্তান তারাদাস বন্দোপাধ্যায় . ওনার স্ত্রী মিত্রা বন্দোপাধ্যায় আজীবন পৃষ্টপোষক হয়ে গৌরীকুঞ্জের Chief Patron হলেন . এই সময়েই গড়ে উঠল গৌরীকুঞ্জ উন্নয়ন সমিতি . সভাপতি হলেন – শ্রী তাপস চ্যাটার্জ্জী . ঘাটশিলার পাঁচটি ক্লাব সংস্কৃতি সংসদ, দাহিগোড়া, নেতাজী পাঠাগার, মৌভান্ডার, ইভনিং ক্লাব, বাবুলাইন, বিভূতি স্মৃতি সংসদ, কলেজ রোড, কাশিদা এথলেটিক ক্লাব, কাশিদা-এর কয়েকজন করে জনপ্রিয়, কর্মঠ ও ভাষা অন্তপ্রাণ সদস্যদের নিয়ে গঠিত হল গৌরীকুঞ্জ উন্নয়ন সমিতি . গৌরীকুঞ্জ উন্নয়ন সমিতি ঘাটশিলার বুকে বিভূতি স্মৃতিকে জাগিয়ে রেখেছে . বাংলা ভাষার উন্নতিকল্পে এর সকল সদস্য –সদস্যাই নিবেদিতপ্রাণ . ঘাটশিলা স্টেশনের বাংলা নামকরণ, বাংলায় নিবেদিতপ্রাণ . ঘাটশিলা স্টেশনের বাংলা নামকরণ, বাংলায় ট্রেন চলাচলের ঘোষনার মতো কাজও এরাই করেছেন . প্রতিবছর গৌরীকুঞ্জে বর্ষবরণ – বর্ষবিদায় অনুষ্ঠান হয় . এছাড়া ভাল পূজোর প্রাইজ দেওয়া হয় ঘাটশিলার দুর্গাপূজোর পান্ডেলগুলি নির্বাচন করে . মাধ্যমিক – উচ্চমাধ্যমিকের ছাত্র –ছাত্রীদের প্রতিভা সন্মানে সম্মানিত করে থাকে প্রতিবছর গৌরীকুঞ্জ উন্নয়ন সমিতি . বিভিন্ন দিকে ঘাটশিলার ছেলেমেয়েদের প্রতিভা সম্মানে  সম্মানিত করে থাকে এই সংগঠন .

শ্রী তাপস চ্যাটার্জ্জীর সুযোগ্য সভাপতিত্বে গ্রামে গ্রামে নিয়ে শিশুদের বর্ণপরিচয়, সহজপাঠ এর মতো বাংলা বই বিতরন করা হয় . সারাবছর গৌরীকুঞ্জে বিভিন্ন সংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয় . ২০১৩ সাল থেকে ঘাটশিলা কলেজের বাংলার অধ্যাপিকা ডঃ ভবানী চক্রবর্তীর সম্পাদনায় গৌরীকুঞ্জের নিজস্ব দেওয়াল পত্রিকা  ‘দুন্দুভি’ নিয়মিত প্রকাশিত হয়ে চলেছে . বিভূতি ভিটেতে সাহিত্যের কাজকর্মের যে প্রদীপটি জালিয়ে গেছিলেন বিভূতিবাবু তা আজও অব্যাহত রাখার ইটা একটা প্রয়াস . তৈরী হয়েছে নাট্য একাডেমি . গঠিত হয়েছে তারাদাস মঞ্চ . শ্রী বালমুচু যথারীতি প্রধান পৃষ্ঠপোষক হিসাবে এই  মঞ্চ তৈরীতে সাংসদ কোষ থেকে অর্থ প্রদান করেছেন .

২০১৭ সালে HCL কোম্পানির তত্কালীন জেনারেল ম্যানেজার শ্রী ডি কে চৌধুরীর বদান্যতায় গৌরীকুঞ্জের বাগানটিতে বসার জায়গা ও আভ্যন্তরীণ সাজসজ্জার কাজ সম্পন্ন হয় . এই ভাবে কোন NGO সোলার লাইট এর ব্যবস্তা করে দিয়েছেন . সবার ভালবাসায় ও অক্লান্ত পরিশ্রমে এগিয়ে চলেছে গৌরীকুঞ্জের উন্নয়নের কাজকর্ম . প্রতি ভাষা দিবসে এখানে বসে কুইজ, সেমিনার ও সংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হয় .

শ্রী তাপস চ্যাটার্জ্জীর উদ্দ্যোগে গৌরীকুঞ্জে শুরু হয়েছে – অপুর পাঠশালা . যাঁরা বাংলা শিখতে চান তারাই এই পাঠশালাতে এসে বাংলা ভাষা লেখা ও পড়ার কাজে যোগ দিয়েছেন . প্রতি রবিবার সকাল ১০ টা থেকে ১২টা পর্যন্ত এখানে বাংলার পঠন – পাঠন হয় . শুধুমাত্র ঘাটশিলাই নয়, – অপুর পাঠশালার টানে জামশেদপুর সহ অন্যান্য সহারে বা গ্রামাঞ্চলে যেমন পিপলা, কোকপাড়া, ধালভুমগড় থেকেও ছাত্র ছাত্রীরা গৌরীকুঞ্জে আসেন . শুধুমাত্র বর্ণপরিচয়ই নয় – বাংলা সাহিত্যের আলোচনায় মেতে ওঠেন কলেজের ছাত্র –ছাত্রী ও অধ্যাপাকেরা .যেকোনো ভাষার যেকোনো বয়সের বানুষই এখানে বাংলা শিক্ষা গ্রহন করতে পারেন . সমস্ত রকম রাজনীতির ঊর্ধ্বে উঠে ঘাটশিলার অধ্যাপক, অধ্যাপিকা এবং বিভিন্ন স্কুলের শিক্ষক সিক্ষীকাগন এখানে এসে বাংলা শেখান . শিক্ষা জগতের বাইরে অন্যান্য পেশায় পেশারত বাংলায় সুপন্ডিত মানুষেরাও এখানে শিক্ষা দান করেন বাংলা ভাষাকে বাঁচিয়ে রাখার তাগিদে . গৌরিকুঞ্জে উন্নয়ন সমিতির সভাপতি শ্রী তাপস  চ্যাটার্জ্জীর উদ্যোগ নিচ্ছেন এখানে একটি লায়ব্রেরী গঠন করার জন্য . এইভাবেই ঘাটশিলায় বিভূতিভূষনের স্বপ্নকে সকার করার  উদ্যোগ নিয়েছেন গৌরিকুঞ্জ  উন্নয়ন সমিতির সদস্য – সদস্যারা . নিচে তাদের নাম ও ছবি দেওয়া হল .

Gourikunj Unnyan Samiti President & Secretary

__________________________________________

           

   Gourikunj Unnyan Samiti Member

 __________________________________________